12

September, 2018

University Review

Jagannath University -জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সদরঘাটে অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্বতন জগন্নাথ কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘােষণার মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু। অধ্যাপক ড: এ. কে. এম. সিরাজুল ইসলাম খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৮৫৮ সালে এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাশ করার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। এখানে প্রায় ২৩,০০০ ছাত্র-ছাত্রী এবং ১,০০০ জন শিক্ষক রয়েছেন।

ইতিহাস

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যবহিত প্রাক্তন নাম জগন্নাথ কলেজ, এই নামেই বিংশ শতাব্দীর

অধিকাংশ সময় জুড়ে পরিচিত ছিল। এটি ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ। ১৮৫৪ সালে

ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল নামে এর প্রতিষ্ঠা হ্য। ১৮৭২ সালে এর নাম বদলে জগন্নাথ স্কুল করা হয়।

বালিয়াটির জমিদার কিশােরীলাল রায় চৌধুরী তার বাবার নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। উল্লেখ্য কিশােরীলাল রায় শিক্ষাবিস্তারে আগ্রহী ছিলেন।

১৮৮৪ সালে এটি একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজে ও ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত হয়। এসময় এটিই ছিল ঢাকার উচ্চ শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হলে জগন্নাথ কলেজের স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গ্রন্থাগারের বই পুস্তক, জার্নাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সাজাতে জগন্নাথ কলেজ। গ্রন্থাগারের ৫০ ভাগ বই দান করা হয়। জগন্নাথ কলেজে আই,এ, আই, এসসি, বি,এ (পাস) শ্রেণী ছাড়াও ইংরেজি, দর্শন ও সংস্কৃতি অনার্স এবং ইংরেজিতে মাস্টার্স চালু করা হলেও ১৯২১ সালে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমিত করা হয় জগন্নাথকে। পুরানাে ঢাকার নারী শিক্ষায় বাধা দূর করতে ১৯৪২ সালে সহশিক্ষা চালু করা হয়। ১৯৪৮ সালে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে ১৯৪৯ সালে আবার এ কলেজে স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের  শিক্ষার্থী মােহাম্মদ রফিকউদ্দিন (ভাষা শহীদ রফিক) আত্মত্যাগ করেন। ১৯৬৩ সালে অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পুনরায় কো-এডুকেশন চালু করেন। ১৯৬৮ সালে এটিকে সরকারীকরণ করা হয়, কিন্তু পরের বছরেই আবার এটি বেসরকারী মর্যাদা লাভ করে। ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাশের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়। বর্তমানে মােট ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৬ টি বিভাগের ও ২টি ইন্সিটিউটের মাধ্যমে এখানে  শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ২০শে অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস।

অনুষদ এবং ইন্সটিটিউটসমূহ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মােট ছয়টি অনুষদে ৩৬ টি বিভাগ ও ০২ টি ইনস্টিটিউট রযেছে।

বিজ্ঞান অনুষদ

  • কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
  • গণিত বিভাগ
  • পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ
  • পরিসংখ্যান বিভাগ
  • মনােবিজ্ঞান বিভাগ

বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ

  • হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ
  • ফিনান্স বিভাগ
  • মার্কেটিং বিভাগ
  • ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ

সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদ

  • ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন বিভাগ
  • অর্থনীতি বিভাগ
  • গণযােগাযােগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
  • নৃবিজ্ঞান বিভাগ
  • সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ
  • সমাজকর্ম বিভাগ
  • লােক প্রশাসন বিভাগ
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।

লাইক এন্ড আসায়ন্স অনুষদ

  • মাইক্রোবায়ােলজি বিভাগ
  • ফার্মেসী বিভাগ
  • বায়ােকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়ােলজি বিভাগ • জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়ােটেকনােলজি বিভাগ
  • রসায়ন বিভাগ
  • প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
  • উদ্ভিদ বিজ্ঞানবিভাগ
  • ভূগােল ও পরিবেশ বিভাগ

কলা অনুষদ

  • বাংলা বিভাগ
  • ইংরেজি বিভাগ।
  • নৃবিজ্ঞান বিভাগ
  • দর্শন বিভাগ
  • ইতিহাস বিভাগ 
  • ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
  • ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
  • চারুকলা ও গ্রাফিক্স বিভাগ
  • নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ

আইন অনুষদ

  • আইন বিভাগ
  • ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনাইন্সটিটিউট
  • ইন্সটিটিউট অফ মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ(IML)।
  • আই ই আর

উল্লেখযােগ্য শিক্ষক

বাংলাদেশের অনেক প্রতিভাবান ব্যাক্তিবর্গ গণ এইখানে শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।  তাদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য যেই নাম গুলাে না বললেই নই। যাঁদের নাম গুলাে শুনলেই আমরা চমকে উঠি তারা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা প্রদান এর কাজে নিয়ােজিত ছিলেন। তারা হলেন:

  • হাসান হাফিজুর রহমান,বাংলা বিভাগ(কবি ও সাংবাদিক)
  • ড.আবুল কালাম আজাদ,গণিত বিভাগ(শহীদ বুদ্ধিজীবী)
  • মাে. কামরুল আলম খান,পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ(পাথরকুচি থেকে বিদ্যুত্ উদ্ভাবক)
  • মুনীর চৌধুরী
  • আলাউদ্দিন আল আজাদ,বাংলা বিভাগ(ঔপন্যাসিক) 
  • শওকত আলী,বাংলা বিভাগ(কথাসাহিত্যিক)
  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,বাংলা বিভাগ(কথাসাহিত্যিক)
  • রাহাত খান,বাংলা বিভাগ(সাংবাদিক ও সাহিত্যিক)
  • সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য,ইতিহাস বিভাগ(শহীদ বুদ্ধিজীবী)
  • সৈয়দ আব্দুল হাদী,বাংলা বিভাগ(সঙ্গীত শিল্পী)
  • অজিত কুমার গুহ,বাংলা বিভাগ(ভাষা সৈনিক ও সাহিত্য সমালােচক)

উল্লেখযােগ্য শিক্ষার্থী

এবার আসা যাক শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে জেনে অনেক হবেন যে এই দেশ এর প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন  এই বিশ্ব বিদ্যালয় এর ছাত্র।এমন আরও অনেক গুনি-মানি জন এখান থেকে শিক্ষা অর্জন করে গিয়ে বাংলাদেশ এর বিভিন্ন জায়গাই অবদান রেখেছেন। এমন কয একজন হলেন

  • তাজউদ্দীন আহমেদ – (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী);
  • রফিকউদ্দিন আহমদ (ভাষা শহীদ);
  • জহির রায়হান (কথা শিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালক);
  • দীনেশচন্দ্র সেন(মৈমনসিংহ গীতিকার লেখক);
  • আনিসুজ্জামান (শিক্ষাবিদ); 
  • মানকুমার বসু ঠাকুর (ব্রিটিশবিরােধী নৌ বিদ্রোহের শহীদ)
  • শওকত আলী (রাজনীতিবিদ)(ভাষা আন্দোলনের নেতা);
  • সৈয়দ শামসুল হক (সাহিত্যিক);
  • আবুল মনসুর আহমেদ(সাহিত্যিক);
  • ব্রজেন দাস (ইংলিশ চ্যানেল পাঁড়ি দেয়া সাঁতারু);
  • প্রেমেন্দ্র মিত্র (বাঙালি কবি, ছােটগল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রপরিচালক);
  • জয়নুল আবেদীন (চিত্রশিল্পী);
  • এটিএম শামসুজ্জামান (অভিনেতা;
  • ইমদাদুল হক মিলন (লেখক , সম্পাদক – দৈনিক কালের কণ্ঠ;
  • জাহিদ হাসান (অভিনেতা);
  • শামীম জামান(অভিনেতা);
  • বিপ্লব (শিল্পী);
  • জুয়েল আইচ (যাদুকর);
  • ফারুক (অভিনেতা;
  • রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজু (সাবেক ডাক ও টেলিযােগাযােগ মন্ত্রী;
  • প্রবীর মিত্র (অভিনেতা;
  • মীর সাব্বির (অভিনেতা;
  • নাসির উদ্দীন ইউসুফ(মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক;
  • শামসুজ্জোহা (প্রথম শহীদ)
  • হায়দার হােসেন (সঙ্গীত শিল্পী);
  • কাজী মােতাহার হােসেন (লেখক);
  • ফকির আলমগীর (মুক্তিযােদ্ধা ও বিখ্যাত শিল্পি;
  • কিরণ চন্দ্র রায় (শিল্পি;
  • আবদুল হালিম চৌধুরী জুযেল (বীর বিক্রম);
  • এম হামিদুল্লাহ খান (বীর প্রতীক;
  • মােফাজ্জল হােসেন চৌধুরী মায়া (বীর বিক্রম;
  • সাদেক হােসেন খােকা (সাবেক মেয়র, ঢাকা)
  • আতাউর রহমান খান (সাবেক প্রধানমন্ত্রী);
  • শেখ ফজলুল হক মনি
  • সাঈদ খােকন (মেয়র,ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন)
  • ভবতােষ দত্ত (অর্থনীতিবিদ); 
  • মােহাম্মদ নাসিম(স্বাস্থ্যমন্ত্রী);
  • আসাদুজ্জামান খান কামাল(স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী;
  • নুরুল মােমেন (নাট্যকার);
  • শামসুজ্জামান খান (মহাপরিচালক,বাংলা একাডেমি)
  • ব্যারিস্টার এম আমীরুল ইসলাম(স্বাধীনতার ঘােষণাপত্র রচয়িতা)
  • কাজী আরেফ আহমেদ (মুজিব বাহিনীর গােয়েন্দা প্রধান)
  • এ আর ইউসুফ (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)

এই বিশ্ব বিদ্যালয় এর সকল সুযােগ সুবিধা প্রদান এর জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্র, আবাসিক হল এবংখেলার মাঠ আছে।

স্বাস্থ্য কেন্দ্র 

জবিতে স্বাস্থ্য রক্ষার মৌলিক সুবিধাদি সম্বলিত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। রােগ নির্ণয়ে সহায়ক অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন, আলট্রাম্নোগ্রাম, ই.সি.জি. মেশিন এবং আধুনিক স্বয়ংপূর্ণ একটি প্যাথলজিক্যাল ল্যাব আছে। এটি নতুন ভবনের নিচতলায় অবস্থিত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যাল্যের একটি আধুনিক আ্যামবুলেন্স ও রয়েছে।

আবাসিক হল

ছাত্রদের থাকার সুবিধার্থে ডিসেম্বর, ২০১১ইং তারিখ পর্যন্ত সর্বমােট ১০টি হল বা ছাত্রাবাস রয়েছে; তন্মধ্যে ১টি ছাত্রীদের হল। উল্লেখ্য এই সবগুলাে হলই বেদখল হয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই। হলগুলাে হলােঃ

  • বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল(নতুন ছাত্রী হল)
  • ড.হাবিবুর রহমান হল,
  • বাণী ভবন হল,
  • আব্দুর রহমান হল,
  • শহীদ আনােয়ার শফিক হল,
  • তিব্বত হল,
  • সাইদুর রহমান হল,
  • রউফ মজুমদার হল,
  • শহীদ আজমল হােসেন হল,
  • বজলুর রহমান হল,
  • নজরুল ইসলাম খাঁন হল,
  • শহীদ শাহাবুদ্দিন হল।

কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও শরীরচর্চাকেন্দ্র

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই ধুপখােলায় অবস্থিত। থেলার মাঠটি ১০ একর জায়গা নিয়ে অবস্থিত। খেলার মাঠের পাশেই শরীরচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। কেরানীগঞ্জে জবির নতুন ক্যাম্পাসে একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি একটি হল নির্মাণ করা হবে।

সংগঠন

চাহিদা অনুযায়ী এখন এ বিভিন্ন সংগঠন ও আছে। যেমন: 

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক

  • উদীচী
  • চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
  • জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
  • জবি ফটোগ্রাফিক সােসাইটি
  • জবি আবৃতি সংসদ
  • জবি থিয়েটার ও চলচ্চিত্র সংসদ
  • জবি সাংবাদিক সমিতি
  • জবি রােভার স্কাউট
  • বিএনসিসি
  • জবি শিক্ষক সমিতি
  • জবি ডিবেটিং সােসাইটি
  • প্রতিরুদ্ধ
  • বাঁধন।
  • কনজিউমার ইউথ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞান

  • বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ
  • বাংলাদেশ ওপেন সায়েন্স অর্গানাইজেশন

বিবিধ

  • জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফায়ারফক্স ক্লাব
  • জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মুটকোর্ট সােসাইটি

ছাত্র সংগঠন

বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলাে হল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।

শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালটি এবং নিজের নাম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ স্থান এর মাঝেই জাইগা করে নিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Want new articles before they get published?
Subscribe to our Awesome Newsletter.

12

September, 2018

University Review

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৫৩ সালের ৬ এপ্রিল যাত্রা শুরু করা ৭৫৩ একরের এই বিশাল সবুজ ক্যাম্পাসটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ডঃ সোনানি টমাসের পরিকল্পনায় নির্মিত এই ক্যাম্পাসটি যেমন পরিপাটি তেমনই সুন্দর। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ আছে প্রায় ৬০টির কাছাকাছি এবং শিক্ষার্থী আছে প্রায় ৩৫০০০। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পোড়াতে হয়েছিল অনেক কাঠ খড়।
দেশ ভাগের পূর্বে অর্থাৎ ইংরেজ শাসনামলে বর্তমান উত্তরবঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার তেমন প্রসার না থাকায় ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় রাজশাহী কলেজ। কিন্তু বছরখানিক পর তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর যখন সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত করা হয় তখন রাজশাহীতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য জনমত গড়ে ওঠে।
১৯৫০ সালে ৬৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৫২ সালের ১০ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী এই কমিটি দুটি সভা কর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলন এতটাই তীব্র আকার ধারন করে যে ১৫জনেকে সে সময় কারাবরণ করতে হয়। এরপর ১৯৫৩ সালের এক জনসভায় পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী জনাব মাদার বখশ , বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী না হলে রাজশাহীকে আলাদা প্রদেশ ঘোষনার হুমকি দেন। তার এই হুমকি কাজে আসে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইন সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাশ হয়। এবং একই বছর ৬ এপ্রিল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে।
প্রথমদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ শুরু হয় রাজশাহী কলেজে।প্রশানিক কাজ চলে পাশের রেশম কুঠিতে। ১৯৫৬ সালে মতিহারে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ক্যাম্পাস তৈরীর কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৪ নাগাদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব ক্যাম্পাসে সম্পুর্ণভাবে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি যেমন তৈরী হয়েছিল এক আন্দোলনের মাধ্যমে, তেমনি দেশের স্বাধীনা যুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। যার প্রমাণ হয়ে আছেন শহীদ শামসুজ্জোহা,শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার,শহীদ হবীবুর রহমান স্যারদের মত শহীদ বুদ্ধিজীবীরা।

এই বিশাল ক্যাম্পাসে রয়েছে ৫টি উচ্চতর গবেষণা ইন্সটিটিউট, ৫টি অনুষদের অধীনে প্রায় ৬০টি বিভাগ। এই সব বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য রয়েছে ১০টির মত একাডেমিক ভবন। চমৎকারভাবে সাজানো এই ক্যাম্পাসে এক দিকে রয়েছে প্রথম,দ্বিতীয়,তৃ্তীয় ও চতুর্থ নামের চারটি বিজ্ঞান ভবন। অন্যদিকে রয়েছে রবীন্দ্র ভবন, মমতাজ উদ্দীন কলা ভবন,শহীদুল্লাহ কলা ভবন এবং সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবন নামের চারটি একাডেমিক ভবন যা ব্যবহৃত হয় মানবিক এবং বানিজ্য বিষয়ক বিভাগের শিক্ষাকার্যক্রমে। এছাড়াও কৃষি অনুষদ ও চারুকলার জন্য হয়েছে আলাদা আলাদা ভবন সম্বলিত ক্যাম্পাস যা মূল ক্যাম্পাসের সাথেই লাগোয়া। আইবিএ এর জন্য রয়েছে তাদের নিজস্ব ভবন এবং ক্যাম্পাস। বলাবাহুল্য, কৃষি অনুষদের ব্যবহারিক এবং গবেষণার জন্য রয়েছে নাড়িকেলবাড়িয়া নামক আরেকটি ক্যাম্পাস।।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে রাজশাহী,বগুড়া,রংপুর মেডিকেল কলেজ সহ আরো বেশ কিছু স্কুল কলেজ,যার কিছু কিছু এই ক্যাম্পাসের ভেতরেই অবস্থিত।
দুইটি প্রাসাশনিক ভবন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক প্রধান ফটকের সামনে। তার পাশেই বিশাল কেন্দ্রীয় মসজিদ।মসজিদের সামনেই স্মৃতিসৌধ। একদিকে সিনেট ভবন আর ডীনস কমপ্লেক্স।
ক্যাম্পাসের উত্তর পূর্ব দিক জুড়ে রয়েছে ছাত্রদের জন্য ১১টি আবাসিক হল ৷প্রতিটি হলের সামনেই আছে বিশাল মাঠ ও পুকুর। ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৬টি আবাসিক হল যা ক্যাম্পাসের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত৷ এছাড়াও গবেষক ও বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের ডরমেটরি রয়েছে। যার নাম শহীদ মীর কাইয়ুম হোসেন ইন্টারন্যাশনাল ডরমেটরি। পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে রয়েছে শিক্ষক ও কর্মকর্তার-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক এলাকা৷
বাংলাদেশে একমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম। এছাড়াও রয়েছে নিজস্ব সুইমিংপুল,ইন্ডোর স্টেডিয়াম ও জিমনেশিয়াম, মন্দির,মেডিকেল সেন্টার,বিজ্ঞান ও প্রেস ভবন,ক্যাফেটেরিয়া, বিশাল তিনতলা বিশিষ্ট লাইব্রেরী, প্রায় তিন হাজার আসন ক্ষমতা সম্পন্ন কাজী নজরুল ইসলাম অডিটরিয়াম, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তন, নিজস্ব ওয়ার্কশপ এবং বাস স্টেশন, বিএনসিসি ভবন, মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালা,প্রথম উপাচার্য স্যার জুবেরীর নামে আছে একটি বিশাল গেস্ট হাউজ এবং অগণিত গবেষনা ইন্সটিটিউট।
আর আছে বিখ্যাত প্যারিস রোড। যার বিশাল প্রশস্ত রাস্তার দুইধারে আকাশছোয়া গগণ শিরিশ গাছ। রয়েছে আম ও লিচু বাগান। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে আছে বদ্ধভূমি,সাবাশ বাংলা স্ফুলিঙ্গের মত মনুমেন্ট,লোকাল ট্রেনের জন্য একটি স্টেশন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনে করেছেন বাংলাদশের অনেক অনেক নামী দামী ব্যক্তিবর্গ। যেমনঃ নাট্যকার মলয় ভৌমিক, গণিতবিদ সুব্রত মজুমদার, অভিনেত্রী[ শর্মিলী আহমেদ, সংগীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোর, কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, ক্রিকেটার আল আমীন হোসেন,প্রফেসর এমিরেটাস অরুণ কুমার বসাক স্যার,একুশে পদক ও বাংলা একাডেমী পুরস্কার বিজয়ী সনৎ কুমার সাহা, কবি মহাদেব সাহা, বিচারক কৃষ্ণা দেবনাথ সহ আরো অনেকেই।
পূর্বে সূর্য্য উঠে আলো ছড়ায় মতিহারের সবুজ চত্বরে। গগণ সিরিশের পাতার ফাক গলে রোদ এসে পরে প্যারিস রোডে। কর্মব্যাস্ততা শুরু হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। টুকিটাকি চত্বর, ওয়ালস্ট্রীট,জুরাসিক চত্বর কিংবা শহীদুল্লাহ আর মমতাজের আম বাগান মুখরিত হয় ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে। দুপুরের অলস ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয়ে ওঠে গান, নাচ, নাটক,বিতর্ক সহ সব ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।শেখ রাসেল,পুকুর পাড়,আম বাগানগুলো সাক্ষী হয়ে থাকে নানান ভবিষ্যৎ স্বপ্নের। এভাবেই কর্ম্ব্যস্ততার মাঝে ঢলে পরে সুর্য।গোধুলীর আগে জুবেরী, সাবাশ বাংলা, হবিবুরের মাঠগুলো ক্লান্ত দাপুটে ছেলে গুলোর জন্য মমতাময়ীর রূপ নেয়। ধীরে ধীরে রাত বাড়ার সাথে সাথে যে যার নীড়ে ফিরে। বাংলাদেশের বুকে মাথা উচু করে স্বগৌরবে বিশাল এক ক্যাম্পাস আর ইতিহাস নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
Want new articles before they get published?
Subscribe to our Awesome Newsletter.

Share This