আজ আবারাে তােমাদের স্বাগতম জানাই তরঙ্গের ভূবনে! গতপর্বে আমরা দেখেছিলাম যে তরঙ্গ কত প্রকারের হতে পারে,এবং বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তরঙ্গের প্রথম প্রকারভেদ ও দেখেছিলাম,যেটি ছিলাে অনুদৈর্ঘ্য এবং অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। আজ আমরা মাধ্যমের উপর ভিত্তি করে তরঙ্গের প্রকারভেদ দেখব। যেটি হলাে
১। যান্ত্রিক তরঙ্গ এবং
২/তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ।

তাে চলাে দেখা যাক এ দুই প্রকারের ভেতর কী লুকিয়ে আছে! তাে প্রথমে আসি যান্ত্রিক তরঙ্গের কথায়। যান্ত্রিক কথাটা শুনতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেশিন আর কলকজার চিত্র! কিন্তু তরঙ্গের ক্ষেত্রে কিন্তু বিষয়টা মােটেও এমন না!তবে যান্ত্রিক নাম দেওয়া হলাে কেন?অবশ্যই কোন কারণ আছে! একটু খেয়াল করলে দেখাে বন্ধুরা,যন্ত্র কিন্তু একা চলতে পারে। !তাকে চালিত করতে হয়!আমি জানি এখন অনেকেই চোখপাকিয়ে বলবে,তাহলে স্বয়ংক্রিয় মেশিন,হিউমনয়েড রােবােট গুলি একা একা চলল কীভাবে?অবশ্যই খুব সুন্দর প্রশ্ন।কিন্তু বন্ধুরা দেখাে যে,তুমি যে স্বয়ংক্রিয় মেশিনই বলাে না কেন,তাকে চালিত করতে এবং ভবিষ্যতে কাজ করাতে গেলে অবশ্যই কাউকে না কাউকে একচালিত করতেই হবে!স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের চালক হলাে প্রােগ্রাম বা । নির্দেশাবলি!যে নির্দেশগুলি আমার তােমার মতাে মানুষেরাই তৈরী করে ওতে পুরে দিয়েছেন!তাহলে হলাে তাে সংশয় দূরীভূত?তাহলে যান্ত্রিক অর্থ যার চলতে কাউকে প্রয়ােজন হয়!আমরা মানুষ,সামাজিক। জীব।আমাদের হরহামেশাই সবাইকে প্রয়ােজন হচ্ছে!একা একা বাচার সাধ্য আমাদের নেই!এখন দেখাে যান্ত্রিক তরঙ্গ টা আসলে কী:..

যান্ত্রিক তরঙ্গ হলাে সেই তরঙ্গ যার চলাচল করতে একটি মাধ্যমের প্রয়ােজন হয়! মাধ্যম ব্যতীত এ তরঙ্গ চলতে পারে নাহ!এখন কথা হলাে আমরা তাে আগের দিন দেখলাম যে মাধ্যমের সাথে চলাচলের উপর ভিত্তি করে তরঙ্গ দুই রকম এক অনুদৈর্ঘ্য আর দুই অনুপ্রস্থ। তাহলে এ দুই রকম তরঙ্গই কী যান্ত্রিক তরঙ্গের ভেতরে পড়বে? কথাটা হলাে যে তরঙ্গই হােক,এখানে বৈশিষ্ট্য টা বড় নয়! আমাদের শুধু দেখতে হবে যে। তরঙ্গ টা মাধ্যম দিয়ে যায় কী না!যদি যায় তবে তা যান্ত্রিক হবে!এখন অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গে আমরা দেখেছি যে শব্দ এক অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ! কারণ সে মাধ্যমের সাথে সংকোচন আর প্রসারণের মাধ্যমে চলাচল করে!এখন কথা হলাে সে কী যান্ত্রিক তরঙ্গ?অবশ্যই সে যান্ত্রিক!কারণ তার চলাচল করতে মাধ্যমের প্রয়ােজন হয়েছে!একইভাবে পুকুরে ঢিল ছুড়লে আমর যে তরঙ্গ দেখি সেটাও যান্ত্রিক তরঙ্গ!কেননা সেখানেও তরঙ্গটা একটি মাধ্যমের ভেতর দিয়েই যায়!কী মাধ্যম বলতাে? ঠিক ধরেছ,পুকুরের পানিই সেই মাধ্যম…

এখন বন্ধুরা একটু মনােযােগী হয়ে চিন্তা করাে,কোন জায়গায় পর্যায়বৃত্ত আন্দোলন হচ্ছে!অর্থাত ক্রমাগত কোনকিছুর রিপিটেশন ঘটছে!সেই রিপিটেশন চলতে আরম্ভ করল এক নির্দিষ্ট দিকে! এখন চলার পথে সবাই যদি তার রিপিটেশনকে অর্থাৎ পর্যাবৃত্ত আন্দলনকে থামানাের চেষ্টা করে তাহলে কী সে বেশিদূর চলতে পারবে?তুমি দৌড়চ্ছ,সবাই তােমায় বাধা দিলে তুমি আর কতদুর অগ্রসর হবে বলাে? প্রথমে দৌড়নাের গতি কমে আসবে, আস্তে আস্তে তুমি থেমে যাবে তাই তাে?যান্ত্রিক তরঙ্গের বেলাতেও ঠিক এমনটিই ঘটে!যেহেতু যান্ত্রিক তরঙ্গ চলে মাধ্যমে,কাজেই মাধ্যমের কণাগুলির সাথে অনবরত সংঘর্ষ করে তাকে চলতে হয়! ফলে তার উদ্ভুদ হবার সময়ে যে স্ফুর্তি ছিলাে,তা সময়ের সাথে সাথে নিঃশেষ হয়ে যায়! অর্থাৎ তার পর্যাবৃত্ত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায় এবং একসময় তার পর্যাবৃত্ত আন্দোলন স্তিমিত হতে হতে শুন্যে। পতিত হয় এবং তরঙ্গটির পরিসমাপ্তি ঘটে!এটিও কিন্তু যান্ত্রিক তরঙ্গের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বন্ধুরা…

যদি এখনাে বুঝতে একতু বাকি থাকে,তবে এই উদাহরণ দুইটি আশাকরি তােমাদের সব সংশয় দূর করে দিবো আমরা আগেই বলেছি যে শব্দ হলাে এক যান্ত্রিক তরঙ্গ। এখন লক্ষ্য করাে তুমি স্পিকারে বেশ জোরে গান বাজাচ্ছ•••

ফাকা মাঠের ভেতরে,তাহলে তােমার শব্দ বাধা পাবার কোন সম্ভাবনা রইল না। এখন তুমি যদি শব্দের জায়গা মানে স্পিকার থেকে সরে ক্রমাগত মাঠের কোণার দিকে যেতে থাকো,তাহলে কিন্তু তুমি আস্তে আস্তে কম শব্দ শুনতে পাবে,এভাবে দূরে যেতে যেতে এমন এক সময় আসবে যখন তুমি তােমার স্পিকারের আর কোন শব্দই শুনতে পাবে না!আচ্ছা বলতাে,তাই বলে কী স্পিকার থেমে। গেছে?মােটেও না,আসলে স্পিকার থেকে আসা তরঙ্গগুলি যাত্রাপথের বাতাসের সাথে অনবরত সংঘর্ষ করেছে! আবার বাতাস ছাড়াও কিন্তু আমরা শব্দ একেবারেই শুনতে পাব না!কারন যান্ত্রিক তরঙ্গ মাধ্যম ছাড়া চলতেই পারে না!সুতরাং আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে যান্ত্রিক তরঙ্গ মাধ্যম ছাড়া চলে না এবং মাধ্যমে চলতে চলতেই তার শক্তি নিঃশেষিত হতে থাকে এবং একসময় তার পরিসমাপ্তি ঘটে।তােমরা পুকুরের পানিতে ঢিল মেরেও ব্যাপারটা বুঝতে পার খেয়াল করবে,যেখানে ঢিল মারা হলাে সেখানে এক প্রবল আন্দোলনের সৃষ্টি হলাে,পর্যায়ক্রমে সেই আন্দোলন কিন্তু পাড়ের দিকে আসতে আসতে কমতে থাকে এবং একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়।এটিই যান্ত্রিক তরঙ্গের মূল বিষয়।

তাে বন্ধুরা,আশাকরি তােমরা যান্ত্রিক তরঙ্গের ব্যাপারটা বুঝতে পারছ৷ এবার যাওয়া যাক সবার আকাঙ্খিত বিষয়টায়,মানে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ তাে এতক্ষণ আমরা দেখলাম যে যান্ত্রিক তরঙ্গ চলে মাধ্যমে এবং একসময় নিঃশেষিত হয়। আর আজ আমরা তরঙ্গের প্রকারভেদ পড়ছি মাধ্যমের উপর ভিত্তি করে,কাজেই একটি যদি মাধ্যমে চলে তবে অপরটি কীভাবে চলবে বন্ধুরা? অবশ্যই মাধ্যম ছাড়া! এখন হয়তাে অনেকেই চোখ বড় বড় করে বলবে,মাধ্যম ছাড়া কণার আন্দোলন হবে কীভাবে! আর আন্দোলন ছাড়া তাকে আমরা তরঙ্গই বা বলব কেনাে!তাই তাে?আচ্ছা এত ব্যস্ত হবার কিছু নাই|আস্তে আস্তে আসছে সবকিছুই…

এখন একটু ধৈর্য্য ধরে চিন্তা কর যে তরঙ্গ কী? অবশ্যই এক পর্যাবৃত্ত আন্দোলন যেখানে স্থানচ্যুতি না হয়েই শক্তি তথা তথ্যের আদান প্রদান সম্ভব। এখন যদি চিন্তা করাে যে তরঙ্গটির মধ্যস্থিত যদি দুটি অংশ থাকে! এখন তারা যদি পরস্পরের সাথে সমকোণে ক্রমাগত আন্দোলিত হতে থাকে!তাহলে ব্যাপারটা কী দাড়ালাে বলাে তাে…ঠিক বুঝেছ, ব্যাপারটা দাড়ালাে ঠিক অনুপ্রস্থ তরঙ্গের মতাে! কাজেই আমরা কিন্তু তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গকে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ হিসেবে কল্পনা করতে পারি!এখন কথা হলাে যে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ তাে আর মাধ্যমের ধার ধারে না! তাহলে এই সমকোণে কে কার সাথেই বা আন্দোলিত হবে! উত্তর খুব সহজ বন্ধুরা! তরঙ্গের নামটিতেই এর উত্তর আছে! নাম কী আমাদের তরঙ্গের? তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ তাই তাে?এখন শব্দটাকে ভেঙ্গে ফেলাে তাে! কী পেলে? তড়িত + চুম্বক = তাড়িতচৌম্বক তাই তাে? তড়িত আর চুম্বক শুনে যারা যারা চোখ বড় বড় করেছ,তাদের বলি, এই তড়িত আত চুম্বক কিন্তু আমাদের সেই চিরপরিচিত শক্তির দুই রূপ৷ তড়িত বা বিদ্যুত ব্যবহার করে নি বা চুম্বক দেখে নি,এমন মানুষ নেই…এখন বন্ধুরা,এই দুইটা অর্থাৎ তড়িত আর চুম্বকই লুকিয়ে আছে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গে! এরা আছে দুইটা ক্ষেত্র রূপে,তড়িতক্ষেত্র আর চৌম্বকক্ষেত্র৷ এই দুই ক্ষেত্র পরস্পরের সাপেক্ষে সবসময় সমকোণে আন্দোলিত হচ্ছে এবং তরঙ্গটি এই দুই ক্ষেত্রের সাথে সমকোনে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে!তােমাদের ঘরের দেয়ালের কোণার দিকটায় লক্ষ্য করাে,দেখাে তিনটি ওয়াল একটি বিন্দুতে এসে মিলেছে।সবাই কিন্তু সবার সাথে সমকোণে অবস্থিত সেখানে!তাে সেই তিন ওয়ালের একটিকে তড়িত,আরেকটিকে চুম্বক ধরে নাও…তাহলে বলাে তাে তরঙ্গটি কোন দিকে অগ্রসর হবে? ঠিক ধরেছ,সে এগবে অপর দেয়াল বরাবর! আশাকরি বন্ধুরা তােমরা তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ কী তা বুঝতে পেরেছ৷ এই তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ যে কী রহস্যময় তার অন্ত নেই: এর প্রথম বৈশিষ্ট্যই তাে কী অদ্ভুত তাই না? মাধ্যম ছাড়া দিব্যি চলে ফিরে বেড়াচ্ছে!এখন বলাে তাে বন্ধুরা,যে মাধ্যমের ধার ধারে না,তাকে কী কেউ আটকাতে পারে!কাজেই তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ তার উতস থেকে বহুদূর পর্যন্ত সঞ্চালিত হতে পারে অনেক শক্তি নিয়ে! তােমরা তাে জানাে বন্ধুরা,মহাকাশে বাতাস বা কিছুই নেই! তাহলে সব তরঙ্গ যদি মাধ্যম ছাড়া চলতে না পারত,তবে কি বিপদটাই না হতাে! আর এজন্যই তাে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের এত গুরুত্বাতােমরা কী জানাে,আমাদের সূর্য হতে প্রতি মুহুর্তেই শক্তি তথা তাপ ও আলাে এই তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের মাধ্যমেই আসছে!চিন্তা করাে । অত দূর থেকেও কী ভীষণ শক্তি এই তরঙ্গের যে গরমের দিনে আমাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা করে ছাড়তে পারে!কজেই এই তরঙ্গের ব্যবহার ও কাজের ক্ষেত্র যে অনেক হবে তাতে আর সন্দেহ কী!তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ অনেক রকমের আছে এবং তাদের একসঙ্গে বর্নালিতে প্রকাশ করা হয়।সেসব আরেকদিন বলব…

তাে একটি কথা বলে আজকের মতাে শেষ করি বন্ধুরা।দেখাে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ তাে মাধ্যমের তােয়াক্কা
করে চলতে পারে!তবে তার গতি তাে অনেক হবে তাই না? তাে বলতাে তার গতি কেমন হতে পারে! আচ্ছা আমিই বলে দিচ্ছি,শুনুস্থানে সব তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের বেস একই এবং তােমরা জানাে তা কত? ৩*১০১ মিটার প্রতি সেকেণ্ডে•••

কী,সংখ্যাটা সবার খুব পরিচিত তাই তাে! তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ কীভাবে এ সংখ্যা পেলাে! আজ না হয় একটু রহস্যই থাকুক!পরবর্তী সংখ্যায় আমরা এ রহস্যের সমাধান করব এবং তরঙ্গের আরাে মজার মজার ধর্ম গুলি জানব!ততােদিন পর্যন্ত ভালাে থেকো সবাই৷ হ্যাপি লার্নিং…

Share This