২০১৫ সালে যে কাউকে ‘সামাজিক দক্ষতা’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আপনি সম্ভবত একটা তালিকা পাবেন সামাজিক গণমাধ্যম এর নিয়মকানুন নিয়ে, কোন অনলাইন সামাজিক নেটওয়ার্ক কেমন ভালো এবং আপনার নিজের নেটওয়ার্ক গড়তে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় গুলোর। এগুলো আর যাই হোক এই পোস্টটি সম্পরকিত ‘নয়’। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতটাই সময় ব্যয় করি যে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘সামাজিক’ হওয়া-তেই মনযোগ দিতে ভুলে যাই। ঘড়ির কাঁটা এ কয়েক বছর পিছিয়ে দিন এবং ‘সামাজিক দক্ষতা’ একগুচ্ছ সঠিক কৌশল এবং চর্চার সমন্বয় যা আমরা পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতির স্বার্থে করে থাকি-এভাবে সংজ্ঞাইয়িত করে হত।

অধিকাংশ সময়, ব্যবসায়ের মালিকগণ, ম্যানেজার, উদ্যোক্তাগণ এবং সি-লেভেল মানুষজন ব্যবসায়ে এতটাই মনোযোগ দেয় যে তারা সামাজিক দক্ষতার সঠিক ব্যবহারের গুরুত্ব ভুলে যায়। ফলাফল বিরূপ হতে পারে এবং ব্যবসায়ের ক্ষতি সাধন করতে পারে, একজন মক্কেল কে বিরক্ত করতে পারে এবং সুযোগের অপব্যবহারের মত ঘটনাও ঘটাতে পারে। সামাজিক দক্ষতা যদি সঠিক ভাবে ব্যবহার করা না যায়, সামাজিকতার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আপনার ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকুক বা আপনি সদ্য শুরু করে থাকেন না কেন, এটা নিশ্চিত করুন যে আপনি এই ১০ টি প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা অনুসরণ করছেন।

১। চোখাচোখি করা মেনে চলুন। আপনার ফোন, ট্যাবলেট, আইপড অথবা ল্যাপটপ থেকে মাথা তুলুন। যখন আমি আমার ডাক্তারের কাছে যাই, আমি খেয়াল করেছি যখন আমি আমার সমস্যার কথা বলি, আমার সাথে চোখাচোখি করা বাদে তিনি তখন তার পিসি তে আমার সমস্যার সমাধান নিয়ে নোট নিতে ব্যস্ত থাকেন, তিনি ভুলেই যান যে আমিও কথোপকথন এর একটি অংশ। আমি বুঝি যে তিনি সঠিক নোট নিচ্ছেন আমার সমস্যা লিপিবদ্ধ করতে-এটা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করতেছেন কিন্তু শুধু একবার স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সাধারণ একপলক আমার দিকে তাকানো টা আরও ভালো হত।। ভুলে যাবেন না যে আপনি মানুষের সাথে কাজ করতেছেন। কথোপকথনের সময় চোখাচোখি একটি বিশাল সামাজিক দক্ষতা।

২। সঠিক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করুন। এটা হল আপনি কি বলেন তা নয়, আপনি কিভাবে বলতেছেন সেটি। অমৌখিক সংকেত অনেক তথ্য সরবরাহ করে এবং আপনাকে এভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম যে অন্য কারো আগ্রহের বিষয়ে আপনি আগ্রহী নন। মনোসংযোগ করুন এবং যোগাযোগ করার জন্য উন্মুক্ত থাকুন। হাত ভাজ করে রাখা, পা ক্রস করে রাখা, শরীর বাকিয়ে দূরে সরে থাকা এবং আরও অনেক অমৌখিক ইঙ্গিত কারো প্রতি অনীহা কে বোঝায়। আপনি যখন কথা বলছে লক্ষ্য রাখুন নিজের প্রতি।

৩। দৃঢ় সঙ্কল্প ও আক্রমণাত্মক হবার মধ্যে পার্থক্য জানুন। আপনার মতামত অন্যদের জানানো এবং যেটা নিয়ে আলোচনা করছেন তা নিয়ে আবেগী থাকা টা ঠিক আছে, কিন্তু সীমা অতিক্রমের দিকে লক্ষ্য রাখুন এবং আপনার মতামত প্র্যোগের ক্ষেত্রে কৌশলী হন যাতে করে যার সাথে আপনি আলোচনা করছে তিনি যেন এটা ভাবে যে তিনি ভুল। আপনি যদি অসন্তোষজনক বা অপমানকর কিছু বলেন, জানবেন আপনি আক্রমণাত্মক হচ্ছেন।

৪। যোগাযোগের কার্যকরী মাধ্যম নির্বাচন করুন। অন্যদের সাথে যোগাযোগ করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। সঠিক পন্থা-ই যে অনুসরণ করতেছেন এটা নিশ্চিত করুন। উদাহরণস্বরুপ কখনোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইমেইল এর মাধ্যমে কোন বিবাদে জড়াবেন না বা যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করবেন না। ইমেইলের মধ্যে কোন আবেগ নেই এবং যেহেতু কম্পিউটারের মাধ্যমে আবেগ, সহানুভূতি এবং অনুভূতি প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য। মুখোমুখি কথা বলে মুঠোফোনে কথা বলার চেয়ে ভালো। এমনকি একটি ‘কমা’-র ভুল ব্যবহার আপনার বক্তব্যের অর্থ পরিবর্তন করে দিতে পারে।

৫। নমনীয়তা এবং সহযোগিতা সামাজিক দক্ষতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। এমন মনোভাব থেকে সরে আসুন যে, আপনার মতামতই একমাত্র এবং সঠিক উপায়। যদিও আপনার মনে হতে পারে যে আওনার মতামতই সঠিক, নমনীয়তা এবং অন্যান্য ধারণার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করস একটি অনুকরণীয় উপদেশ। মনে রাখবেন যে, আপনার জীবনের যেকোন ক্ষেত্রেই অন্যের সহায়তা লাগতে পারে। ন্যের সাথে ধারণা আদান প্রদান করার উন্মুক্ত মানসিকতার সাথে নমনীয় থাকাটাও জরুরী।

৬। আত্মরক্ষা ছাড়াই সমালোচনা শুনতে শিখুন। যখন আপনার ধারণার বিপরীত কোন কিছ বা সমালোচনার সম্মুখীন হবেন, সাথে সাথেই আত্মরক্ষা করবেন না। কি বলা হচ্ছে শুনুন এবং তথ্য উপাত্তগুলো আত্মস্থ করুন, বিশেষ ভাবে যদি আপনার চেয়ে অভিজ্ঞ কেউ কিচু বলেন যখন। যদিও আপনি সমালোচনার জন্য প্রস্তুত নাও থাকতে পারেন, যা বলা হচ্ছে আগে শুনুন। সমালোচনা শোনা খুব একটা সহজ না, আবার যদি তা নিশ্চিত করে বলা হয়; কিন্তু ‘সামাজিক দক্ষতা ১০১’ এটাই বলে যে, মনোসংযোগ করুন এবং শুনতে থাকুন গ্রাহ্যতার সাথে।

৭। সব সময় ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করুন। ইতিবাচক মনোভাবের সাথে সফলতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অতি সামাজিক মানুষেরা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন এবং তারা সফলও হন। কে-ই বা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে চায়? ইতিবাচক মানুষেরা আকষণীয় হন এবং জীবনে উন্নতি করেন। ইতিবাচক মানুষেরাও উত্থানপতন্র স্বীকার হন তবে তারা আত্মসমবেদনা, সন্দেহ ও নেতিবাচকতায় ভুগেন না।

৮। শিক্ষাগ্রহণে ইচ্ছুক হোন এবং একজন ভালো শিক্ষানবিশ হন। উদ্যোক্তাগণ নিয়মিত শিখছেন। তারা কার্য  সঠিক ভাবেসমাধার জন্য নতুন নতুন পন্থা খুজেন। শিক্ষাগ্রহণে সর্বদা ইচ্ছুক থাকুন এবং অন্যদের থেকে শিখতে কখনোই কার্পণ্য করবে না। সামাজিক দক্ষতা শিখতে যেয়ে, শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী হলে আপনি জ্ঞানের জন্য আপনি নম্র ও তৃষ্ণার্ত হবেন এবং আপনাকে প্রশ্ন করতে উদবুদ্ধ করবে। বিশেষজ্ঞগণ তাদের বিশেষজ্ঞতার বিষয়ে প্রশ্ন পছন্দ করেন। প্রশ্ন করুন ( তবে কারো রাগের কারণ হবেন না), শিখতে আগ্রহী থাকুন এবং ফলস্বরূপ সামাজিক হবেন।

৯। অন্যদের প্রতি সম্মান দেখান। অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো আপনাকে মূল্যায়প্নের একটি অন্যতম মাপকাঠি তাই আপনি চাকুরী ক্ষেত্রে বা জীবনে যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন। যখন আপনি কাউকে সম্মান দেখান তার মানে হল তার প্রতি আপনার মনোযোগ প্রকাশ করতেছেন, তাকে ও তার অবস্থাকে প্রশংসা এবং সম্মান করতেছেন। কখনোই নিজেকে অন্যদের চেয়ে ভালো মনে করবেন না, যদিও আপনি সত্যিই তা হন সেটা হোক আপনার অবস্থান, অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান যে কোন মাপকাঠিতেই। সতর্কতার সাথে নম্র থাকা সামাজিক দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ দিক।

১০। মনুষ্যত্বপূর্ণ হন, কারণ সবকিছুর পর এটাই আপয়াকে অনন্য করে তুলবে। অস্কার ওউয়াইল্ড বলেছেন, “আপনি যা তাই-ই হন, কারণ আর কেউ বাকি নেই অনুসরণ করবার মত।” ‘নিজ’ হবার মধ্যের সবচেয়ে বড় পাওয়া হল এটা উপভোগ্য এবং জানা যে অন্য কেউ এটাতে আপনার চেয়ে ভাল করতে পারবে না। অন্য কারো মত হওয়া বা কাজ করার দরকার নেই। এর জন্য আপনাকে উদ্ধত, অহংকারী হবার দরকার নেই বা সমোঝতা না করার মনোভাব পোষণ করার দরকার নেই; নমনীয় থাকুন, সাথে সুখী এবং ইতিবাচক। আপনার নিজের সম্ভাব্য সর্বোচ্চত্তা তে আরোহণ করুন এবং আপনার আশেপাশের মানুষ আপনার সঙ্গ পছন্দ করবে।

উপরের ১০ টি প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা দেখে মনে হতে পারে যে এগুলো সাধারণ চেতনা, কিন্তু আপনি কর্মক্ষেত্রে অনন্য চেতনাসমূহের দ্বারা সংক্রমিত হওয়া দেখে অবাক হবেন। এবং এই তালিকার সুন্দর দিকটি হচ্ছে, এটার পরিব্যাপ্তি ব্যবসা ছাড়িয়ে বহুদূর। এই সামাজিক দক্ষতা গুলো আপনারে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেনে চলুন এবং আপনি দেখবেন যে সফলতাই আপনাকে খুজে নিচ্ছে।

সূত্রঃ https://www.huffingtonpost.com/doug-a-sandler/10-social-skills-essentia_b_7203280.html

Share This