প্রত্যেকেই তার চাকুরীর ইন্টারভিউ এর আগে একটু হলেও চিন্তিত হয়ে পড়ে। এটা খুবই স্বাভাবিক। ঘর্মাক্ত তালু, বুকের ঢিপঢপানি, হাঁটু কাঁপা মুহূর্ত যখন আপনি অপেক্ষা করতেছেন ইন্টারভিউ এর জন্য যে কখন আপনার পালা আসবে? আমিও ওই সময় পার করেছি।

ইন্টারভিউ এর আগে কিছু মানসিক প্রস্তুতি থাকা একটি ভালো দিক। এটা পূর্বপ্রস্তুতির চেয়েও ভালো এবং আপনার চিন্তাশক্তি আরও বৃদ্ধি করে ইন্টারভিউ এর সময়ে। ঝামেলা তখনই হয়, যখন স্নায়বিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং আপনার স্পষ্ট করে চিন্তা করবার ক্ষমতা কে ছাপিয়ে যায় ও আপনি থতমত খেয়ে যান এবং বাকশুন্য হয়ে যান একটি কৌশলী প্রশ্নের উতর দিতে যেয়ে।

যদি আপনার স্নায়বিক অবস্থা এমন হতে চায়, তবে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই সহজ পন্থা গুলি অবলম্বনের মাধ্যমে আপনি, আপনার ইন্টারভিউ সংবলিত দুশ্চিন্তা দূর করতে সক্ষম হবেন এবং এটাও নিশ্চিত করতে পারবেন যে, ওই বিশেষ দিনে আপনার মনোযোগ যেন চাকুরীর দিকে থাকে।

 

আপনি অতিমাত্রায় প্রস্তুত হতে পারেন না

ইন্টারভিউ রুমে আমদের নিজেদের উপর নিয়ন্তণ এর অভাব একটা দুশ্চিন্তার বিষয়। পরিহাসের বিষয় এই যে, সবচেয়ে ভালো প্রার্থীও,সফল হতে সক্ষম; যদি নেজের উপর বেশি চাপ নেয় তহলে সেও এই ক্ষেত্রে অনেক ভুগবে। ইন্টারভিউ অনেক বড় মাপের বাজি এবং আপনি অনে চাপ নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেন।

ইন্টারভিউ এর দিন আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হল, প্রস্তুত থাকা। এটার মানে শুধু এইই নয় যে, কোম্পানি সম্পর্কে জ্ঞান রাখা এবং কিছু সাধারণ প্রশ্ন আয়ত্ত করা; বরং প্রস্তুতি মানে সকল বাস্তবিক বিষয়গুলি অফিস কোথায়, পরিধেয় বস্ত্রের দিক নির্দেশনা, কেমন ধরনের ইন্টারভিউ এ আপনি অংশগ্রহন করতে যাচ্ছেন; ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কেও জেনে রাখা। আপনার প্রস্তুতি সময়মত শেষ করুন, যাতে আপনি ইন্টারভিউ এর আগের রাতে নিরুদবিগ্ন থাকেন। ওই সব গৎবাঁধা প্রশ্ন গুলি ৩য় বারের মত চোখ বুলানোর চেয়ে বিশ্রাম নেওয়া খুবসম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ, সুতরাং নিজেকে সময় দিন এবং আগের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ুন।

পরিচয় পর্বের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখুন

কিছু কিছু সাক্ষাত হয় এমন যে, আপনি যেন ‘ক্লিক’ করার মাধ্যমেই অপর জনের সাথে পরিচিত হয়ে গেলেন। যোগাযোগ করা সহজ এমনকি আপনি টের পাবার আগেই যে আপনার দৈহিক ভাষা সমন্বয় পূর্ণ হয়েছে। পূর্বপরিচিত বন্ধুর মত আপনি হাসলে এবং কথাবার্তা বললে সব স্নায়বিক চাপ দূর হয়ে যাবে।

এবং এমন কিছু সাক্ষাত আছে যেখানে অতটা সহজে উক্তরূপ ভালো শুরু হয় না।

পরিচয় পর্ব স্বাভাবিক ও সহজ ভাবে শুরু করার জন্য একটি ভালো উপায় হল কিছু বাক্যাংশ আগে থেকেই ঠিক করে রাখা। প্রায় সব ইন্টারভিউ এর ক্ষেত্রেই আপনাকে অভ্যর্থনা কক্ষে অথবা ওই রকম কোন যায়গায় অপেক্ষা করতে হয় কখন আপনার ডাক পড়বে তাই। তারপর কেউ আপনাকে ডাকতে আসে, কিছু হাই হ্যালো ও করমর্দন শেষ হয়; পরে লিফট অথবা অফিসের মধ্য দিয়ে আপনাকে সঠিক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই অল্পসময়টাকে যতটা সম্ভব নিজেকে নিরুদবিগ্ন রাখুন, আপনাকে পথ প্রদর্শনকারীর সাথে কথা বলতে পারেন। জিজ্ঞেস করতে পারেন কোম্পানির উত্থানের সময় কারা ছিলেন, নিকটবর্তী সময়ের কোন কারখানার উন্নয়ন সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন অথবা জিজ্ঞেস করতে পারেন কতদিন যাবৎ তিনি কোম্পানিটির সাথে আছেন। এমনকি শুধু আবহাওয়া সম্পর্কে কথা বলাও ভালো আপনার জন্য, পুরোপুরি নিশ্চুপ থাকার চেয়ে। এবং এটা আপনাকে আরও উদবেগ কমাতে সাহায্য করবে।

 

আপনার বাচনভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন হন

ইদানীং কালের গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, আচার-ব্যবহারের ধরন যেটা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে ইন্টারভিউ এর দুশ্চিন্তা এর ক্ষেত্রে। একটা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, যেখানে গবেষকরা ১২৫ জন স্নাতকার্থি এর নকল চাকুরীর ইন্টারভিউ ভিডিও করেছেন। এটা করা হয়েছিল প্রার্থীদের উদ্বেগ মূল্যায়নের জন্য, প্রার্থীদের আচার-ব্যবহার পর্যালোচনা করার জন্য এবং অন্যান্য ইঙ্গিত যেমন পোষাক খোঁটা, উসখুস করা অথবা তাদের স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এড়ানোর মত বিষয়গুলি যাচাই করার জন্য।

মজার ব্যাপার হল, সাক্ষাতকারী এবং প্রার্থী রা শুধুমাত্র স্নায়বিক দুর্বলতা প্রকাশের একটি বিষয়েই একমত হয়েছিলেন, আর তা হল কথা বলার দ্রুততা।আপনি যদি ইন্টারভিউ এর আগে মানসিক ভাবে দুর্বল থাকেন, তাহলে সম্ভাব্য নাক-কান গরম হয়ে যাওয়া/লজ্জায় আরক্তিম হওয়া অথবা হতচকিত হওয়া নিয়ে নয়, বরং মনোযোগ দিন চাপের সময়ও কিভাবে যথাযথ আর ধীর ভাবে কথা বলতে পারেন তা অভ্যাসে। এই অভ্যাস আয়ত্ত করা এবং ইন্টারভিউ এর সময় মাথায় রাখলে, আপনি আপনার উদ্বেগ কমাতে সমর্থ হবেন।

পারস্পরিক যোগাযোগ তৈরি সম্পর্কে ভাবুন

ওই গবেষণায় পাওয়া আরেকটি মজার দিক হল, সাক্ষাতকারীদের কাছে এটা মনে হয়েছিল যে; স্নায়বিক চাপে ভোগা প্রার্থীরা কথাবলার সময় যথেষ্ট আন্তরিক ছিল না। অস্বস্তিতে ভোগাটা আমাদেরকে নির্লিপ্ত করে তুলতে পারে।

এই সমস্যা দূরীকরনে, আত্মবিশ্বাসী প্রার্থী হবার প্রাক্কালে; প্রত্যেকের উচিত কিভাবে পারস্পরিক যোগাযোগ করতে হয় তা জানা এবং শারীরিক ভাষার প্রয়োগ শেখা যেমন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শারীরিক অঙ্গভঙ্গির যথেষ্টতা নিরুপণ করা যাতে তারা আরও সাবলীল ভাবে ইন্টাভিউ এর সময় কথোপকথনে অংশ নিতে পারে। চিন্তাগ্রস্ত প্রার্থীর কাছে এটা খুবই কঠিন হলেও, সচেতন ভাবে শারীরিক ভাষার যথাযথ প্রয়োগ অনেক সাহায্য করবে তাদেরকে। যদি এটাও খুব কঠিন মনে হয়, বড় করে একটা শ্বাস নিন, নিজেকে বলুন যে আপনি তৈরি এবং ইন্টারভিউ এ নিজের মনোযোগ একত্রিভূত করুন, এতেই অনেকটা এগিয়ে যাবেন। আপনি আপনার প্রকৃত সত্ত্বা কে বিকশিত করতে চান, এটা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা তথা দুশ্চিন্তা আপনার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে যদি আপনি আত্মবিশ্বাসী না হন।

অঙ্গভঙ্গি লক্ষ্য করুন

আমার সাথে আপনিও এটি ধারণ করুন। গোসলখানার আয়নায় প্রশিক্ষিত একটা দৃঢ় অঙ্গভঙ্গি যেটা আপনার ইন্টারভিউ রুমের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় কাজে লাগবে, সেটিই আপনাকে চাকুরীটি পাইয়ে দিতে পারে।

যেভাবে আপনার মানসিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটে আপনার বাহ্যিক কাজকর্মে, আপনার শারীরিক অবস্থাও আপনার মানসিক সুস্থতায় প্রভাব রাখে; এবং এটি প্রমাণিত যে কিছু নির্দিষ্ট দৃঢ় অঙ্গভঙ্গি আপনার শরীর এবং মস্তিষ্ককে একইসাথে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে। আপনি Amy Cuddy’TED talk যাচাই করে দেখতে পারেন যদি আস্থা না পান। আপনি আয়নার সামনে একজন ‘সুপারম্যান’ কে আনতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন, কিন্তু এটা যদি আপনাকে আপনার সমস্যার সমাধান দিতে পারে (এবং যেখানে কেউ আপনাকে দেখছে না), তাইলে আপনার হারানোর কি আছে?

 

ইন্টারভিউ এর দুশ্চিন্তা কমানো এমন একটি দক্ষতা যা শেখা সম্ভব। আপনি হয়ত প্রথমেই এটি খুব সুন্দর ভাবে আয়ত্ত করতে পারবেন না, তবে একের পর এক আপনি যত ইন্টারভিউ-এ অংশ নিবেন, অবশ্যই নতুন কিছু শিখবেন এবং আপনার ইন্টারভিউ বিষয়ক দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবেন।

আপনি ইন্টারভিউ এর সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। আপনি আপনার স্নায়ু গুলো একমাত্র এভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন যে, ওগুলো ওদের মত আছে এবং সদা প্রস্তুত থাকা যেকোন কিছু নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। নিজেকে বলুন যে, আপনি এসবের জন্য তৈরি এবং নিজের সহজাত প্রবৃত্তি তে ভরসা রাখুন ওই বিশেষ দিনে উতরে যাবার জন্য। এটার জন্য আপনার কিছুটা সময় যাবে ঠিকই তবে ধীরে ধীরে আপনি আরও যোগ্য হয়ে উঠবেন এবং একদিন সব কিছু ঠিক ঠাক মত হবে। একটি জোরে শ্বাস নিন এবং করে ফেলুন।

সূত্রঃ https://www.heysuccess.com/blog/view/how-to-handle-interview-anxiety#25Sko2KSjbje0WIW.99

Share This